HAZRA SABBIR HOSSAIN

Soldier

Blogs

AAMORI BANGLA VASA

Posted on February 3, 2014 at 5:10 AM

মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা

হাজরা সাব্বির হোসেন

সময়টা ছিল ২০১১ সালের মাঝামাঝি, সবেমাত্র স্নাতক পেরিয়ে স্নাতকোত্তরের আঙিনায় পা দিয়েছি। এমনি একদিন বন্ধুদের আড্ডায় প্রথম অনুভব করলাম, বাংলা বাক্য সাজিয়ে তার সমাপ্তি টানতে পারছি না, বাক্য অসম্পূর্ণ রেখেই নিজের মনোভাব বোঝানোর জন্য একই বাক্য ইংরেজিতে অনুবাদ করছি। সেদিনই প্রথম অনুতাপের আগুনে জ্বলেছি, অনুভব করেছি বাঙালি হয়ে বাঙালিত্ব হারাবার বেদনা।

 

ইদানিং একটা বিষয় খুব লক্ষ করি, বেশ কিছু বাঙালি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঙালির এই আত্মসন্মান বোধের অভাব আজকাল খুবই চোখে পড়ার মত। আমরা সব জায়গায় বাংলা বলি না, ছেলেমেয়ে বাংলা না শিখলে আমরা গর্ববোধ করি। একটু টাকা পয়সা হলেই বাবা মা তাদের সন্তানকে ভাল শিক্ষার নাম করে পাঠিয়ে দেন ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোতে। তাহলে বাংলা মাধ্যমে কি ভাল শিক্ষা দেয়া হয় না? নাকি ভাল শিক্ষা শুধু ইংরেজিতেই হতে পারে।

 

আমরা এক অদ্ভুত কারণে সবসময় পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে রই, পূর্বের দিকে নজর খুব একটা দেই না। পূর্বের দিকে নজর দিলেই দেখতে পেতাম ২০০ বছর গোলামির ইতিহাস, আর বাংলা ভাষার শৌর্যবীর্য। আজ আমরা সেই গোলামির উপঢৌকন নিয়ে কতই না মাতামাতি করি কিন্তু ভুলে যাই বাঙালি হবার মূল শিকড় আমাদের বাংলা ভাষা। যে ভাষা আমাদের জাতীয়তার পরিচয় বহন করে, তাকে ভুলে গেলে আমাদের জন্ম পরিচয় কি প্রশ্নের সম্মুখীন হবে না?

 

বাংলা এমনি একটি ভাষা যার জন্য আমাদের রক্ত দিতে হয়েছে বহুবার। সবার জানা আছে, দেশ বিভাগের পর 'পাকিস্তান' নামে নবীন রাষ্ট্রের জন্ম হবার মাত্র ৫ বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে, পুলিশের গুলিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি চারজন শহীদ হন। শুধু ভাষার দাবিতে প্রাণদানের নজির সারা পৃথিবীতেই বিরল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তার অন্যতম কারণও এ দেশের মানুষের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবি। এর ফলেই পরবর্তীকালে এই একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটিকে UNESCO থেকে পৃথিবীর প্রতিটি দেশেরই 'মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের অর্জন পৃথিবীর ৬,৯১২ টি ভাষাগোষ্ঠীকে শিখিয়েছে মাতৃভাষার প্রতি প্রেম ভালবাসা। আর আজ কিনা আমরাই গোলামি করছি অন্য ভাষার। শুধু এ দেশই নয়, বাংলা ভাষার দাবিতে মানুষ প্রাণ দিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও, এ তথ্যটি হয়ত অনেকেরই জানা নেই। ভারতে আসামের কাছাড় অঞ্চলের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা কিন্তু রাজ্য সরকার সেই ভাষার কোন অধিকার দেয়নি বলে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়েছিল কাছাড়ের শিলচর শহরে। ১ মে, ১৯৬১ সালে সেখানেও মিছিলের ওপর দায়িত্বজ্ঞানহীন পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, মৃত্যু হয় ১১ জন মানুষের। এই চরম শোকাবহ ও লজ্জাজনক ঘটনা বেশি প্রচারিত হয়নি বরং চাপা দেবারই চেষ্টা হয়েছে।

 

অনেকেই এমন মত পোষণ করেন যে, উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিতে হলে ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। তাদের জন্য বলতে চাই, চীনে শতকরা পঁচানব্বই ভাগ লোকের ভাষা ম্যান্ডারিজ, সুতরাং অধিবাসীদের মধ্যে ভাষার ব্যবধান নেই বললেই চলে, কিন্তু ইংরেজি শিক্ষায় সে দেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। তাই বলে কি জাতি হিসেবে তারা পিছিয়ে আছে? ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা সবদিক থেকে তারা ইংরেজি ভাষাভাষীদের সমকাতারে বললে বরং চীনকেই কিছুটা ছোট করা হবে। এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, আর ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষা। এই ভাষার মানুষ কি কখনও হীনমন্যতায় ভুগতে পারে?

 

আগেই বলেছি, এক অদ্ভুত কারণে আমরা পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকি, কখনও পূর্বে তাকাই না। আমাদের পূর্বের দেশগুলো কি করে, সে সম্বন্ধে আমরা খুব কমই জানি। আজকের চীন, কোরিয়া বা মালয়েশিয়া, এদের ভাষা নিয়ে গর্ব দেখলে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। এমনকি জাপান, যদিও কারিগরি বিষয়ে এত উন্নতি করেছে যে দেশ, সেই দেশের বহুলোকই একবর্ণ ইংরেজি জানে না, ইংরেজি না জেনেও চ্যালেঞ্জ করে তারা সবকিছুতেই উন্নত হয়েছে। তবে আমরা কি পারি না? আমরা কি এতই খারাপ, আমাদের ভাষা কি এতই দুর্বল? তা তো নয়। ভাষাতাত্ত্বিকরা বলেন, বাংলা ভাষার এত ঐশ্বর্য, শুধু সংস্কৃত নয়, সব ভাষা থেকে আমরা শব্দ গ্রহণ করি, আমাদের ভাষার দরজা এখনও খোলা। আর ক্রিয়ার উপর বাংলাভাষার দখল অনেক বেশি, যে কোন ভাবই আমরা বাংলায় প্রকাশ করতে পারি। সেই ভাষা নিয়ে আমাদের গর্ব থাকবে না!

 

খুব কষ্ট পাই, যখন দেখি আমাদের দেশের নামি দামি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার্থীরা বাংলাভাষার বিকৃতি ঘটিয়ে নিজের বাংলায় অপারগতা প্রকাশ করে লজ্জাবোধ করছে না কিংবা, যারা বিদেশে গিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করে মাতৃভাষা ভুলে গেছে, বাঙালিদের সাথে মিশতে চায় না, বাংলা গান শোনে না, তারা বিদেশে গিয়ে সাহেব হবে। সাহেব তারা জীবনেও হতে পারবে না; গায়ের রং কোনদিনও পালটাতে পারবে না, পালটানো যায় না। আর যতই সাজ পোশাক থাকুক, সাহেবরা তাদের নেটিভ বা কালো লোকই বলবে। আমরা যাদের খুব ফর্সা বলি তারাও পশ্চিমে কালো। কেন তারা কালো হয়ে থাকল জানি না।

 

এখন আমাদের দেখতে হবে উদাসীনতায় এই ভাষা থেকে, এই সংস্কৃতি থেকে যেন একেবারে বিচ্যুত হয়ে না যাই। উদাসীনতার একটা কারণ ছিল বটে, অনেকে বুঝতে পারেননি ভাষা নিয়ে আবার কি করার আছে? এই তো ভাষা ঠিকই আছে, এইতো আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। ছেলেমেয়েরা শিখছে না তো কি এসে যায়। বাংলা সিনেমার জায়গায় হিন্দি সিনেমা, তাতেই বা কি ক্ষতি। এই ক্ষতির ফলে আস্তে আস্তে বাংলা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল। ভাষাকে সবসময় পরিবর্ধনের চেষ্টা করতে হয়। আসলে, চোখ একটু অন্যদিকে ফেরালেই ভাষা আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে যায়। নদীর মত, অনেক নদী পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভাষাও তাই। আমরা কি বাংলা ভাষাকে সেভাবে হারাতে দেব? সম্মিলিত চেষ্টা আর ভালবাসাই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মরা গাঙে আবার জোয়ার আনতে পারে। মাতৃঋণ পরিশোধের এর চেয়ে বড় আর কি-ই বা উপায় হতে পারে।

 


 

 

প্রকাশিতঃ দৈনিক ইত্তেফাক,ঢাকা, রবিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ২০ মাঘ ১৪২০, ০১ রবিউস সানী ১৪৩৫

অনলাইন লিঙ্ক 

 


Categories: Aticles, Education

Post a Comment

Oops!

Oops, you forgot something.

Oops!

The words you entered did not match the given text. Please try again.

Already a member? Sign In

0 Comments