HAZRA SABBIR HOSSAIN

Soldier

Blogs

How many dies will bring Independence ?

Posted on December 10, 2013 at 10:05 AM

আর কত মৃত্যুর পর এ দেশ স্বাধীন হবে?

এক

আজ ১০ ডিসেম্বর, আমি মুক্তাঞ্চলে বসে চা খেতে খেতে এই লেখাটি লিখছি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ঢাকার সেই কর্ম- ব্যাস্ততা, জ্যামের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। শুনেছি এখন নাকি ঢাকায় জ্যাম হয় না, সেই পুরনো কর্ম- ব্যাস্ততায়ও পড়েছে ভাটা। আমি চা খাচ্ছি মুক্তাঞ্চলে বসে। কি সুন্দর সকাল! ভোর বলাটা ভুল হবে, আর যাই হোক ১০ টাকে কোনভাবেই ভোর বলে চালাতে ইচ্ছে করছে না। তবুও নিজের ভেতরে কিছুটা সংকীর্ণতা অনুভব করছি, একদিকে পুরো জাতি সংগ্রাম করছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে। তাদের প্রতিটা ক্ষণ কাঁটছে এক গভীর আশঙ্কায়, এই বুঝি রাস্তায় সাধের প্রাণটা গেল। আর আমি কিনা মুক্তাঞ্চলে সড়ে ন’টায় ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে তাদের কথা ভাবছি।  এটা নিজ জাতির উপর উপহাস ছাড়া কিই বা হতে পারে। আমার মত সামান্য মানুষের উপহাসে এমন কি আসে যায়, দিনের পর দিন দেশের নামি দামি বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিক, ধর্মপ্রাণ মানুষেরা সাধারণ মানুষের সাথে চা খেতে খেতে যে একই রকম উপহাস করে যাচ্ছে তাতে তো কিছু আসে যায় না। আসলে সবাই দেশ প্রেমিক, কেউ প্রকৃত মানব প্রেমিক নয়। তাতে আমার কি, আমি আছি মুক্তাঞ্চলে।

দুই

এইতো দু’দিন আগে আমার এক সংখ্যালঘু বন্ধু আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, কি করে ঢাকা থেকে মুক্তাঞ্চলের দিকে যাওয়া যায়? তার প্রশ্নটা জেনে আমার বেশ আনন্দ হচ্ছিল, বোঝ এবার ঠ্যালা। বন্ধুর শঙ্কায়ও যে আনন্দ আছে তা বাঙালি ছাড়া আর কোন জাতি অনুভব করে কিনা আমার জানা নাই। তবে বাঙালি জাতির এই অনুভব স্বভাব জাত তা আমার ভালভাবেই জানা, এ নিয়ে আমি কোন তর্কের ধার ধারি না। যে জ্ঞান নিজের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা লব্ধ, তা নিয়ে কোন বিশেষজ্ঞের অযথা প্রলাপ কানে না তোলাই শ্রেয়। এ নিয়ে বিশেষ মাথা নয়া ঘামিয়ে আমার সংখ্যালঘু বন্ধুর প্রশ্নের উত্তরেই মনোনিবেশ করি। প্রথমে কিছুটা আনন্দ বোধ করলেও তাকে দেবার মত উত্তর চিন্তা করে নিজেও খানিকটা চিন্তিত হলাম বটে। কেননা যাত্রা পথের বাকে বাকে যে মৃত্যু ফাঁদ এঁটে আছে তাতে আমার বন্ধুটির প্রাণ সংশয়ও রয়েছে। বন্ধুর মনের সংশয়ে যে আনন্দ পাওয়া যায় তা পুরপুরি মিলিয়ে যায় যদি সেখানে বন্ধুর প্রাণ সংশয় থাকে।

আমি যে মুক্তাঞ্চলে আছি তা ঢাকা থেকে সর্বনিম্ন প্রায় ২৭৫ কিমি দূরে। আর এখনকার সময়ের যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটা ৫০ বছরের পুরনো ব্যবস্থার স্বাদৃশ। সাধারণত এত দুরের পথ যেতে ৫০ বছর আগে আমাদের বাপ দাদারা খুব ভোরে ফজরের ওয়াক্তে রওনা করতেন। খুব আশ্চর্যের ব্যাপার যে, যাতায়াত ব্যবস্থা পুরনো হলেও যাত্রারম্ভের সময়ের মিল রাখাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে নাএখনকার মৃত্যুদূতেরা মানুষের জান-মালের ক্ষতি করাটাকে একটা পবিত্র পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। তারা সারা রাত ইবাদাত বন্দেগী করে ফজরের নামায আদায় করেই সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে সাধারণ মানুষের যাত্রাপথের আঁকেবাঁকে অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন কাকে বেহেশতে পাঠানো যায়। এ দিক থেকে চিন্তা করলে তারা মানব জাতির জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। আমার চেনা এ রকম একজন মহামানব ছিলেন, যিনি অনেক মানুষকে বেহেশতের ভিসা দিতেন। নানির কাছে শুনেছি, তার নাম আর গুনের আনেক গল্প। এ দেশর অনেকে হয়ত তার নাম শুনেছে। তা স্বত্বেও এমন এক মহাপুরুষের নাম উচ্চারণ না করে পারছি না। রজ্জব আলী ফকির নামের সেই শীর্ণ দেহী মহাপুরুষ ছিলেন এক ধর্মপ্রাণ আত্মাতার একটা মহান উক্তি দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে খুবই প্রচলিত, যা কিনা তিনি বেহেশতের ভিসা দেবার সময় উচ্চারণ করতেন- “বাবা তোরও কষ্ট হবে না আমারও কষ্ট হবে না, মাথাটা নিচু কর”।

এই শ্রদ্ধেয় মহামানবদের গুণকীর্তন করতে থাকলে সারাটা দিন কেটে যাবে তার চেয়ে স্ব-প্রসঙ্গে ফিরি। মূল যাত্রা শুরু করতে হবে সকালের বিবিসি সংবাদের পর। যদি সংবাদে ভরসা পাওয়া যায়, তবে রিক্সা করে প্রথমে যেতে হবে সায়দাবাদ। সারা রাস্তায় চোখ কান খোলা রাখতে হবে, আর থাকতে হবে তাৎক্ষণিক দৌড়ের প্রস্তুতি। সায়দাবাদ এসে রিক্সা থেকে নেমে হেটে হেটে যেতে হবে যাত্রাবাড়ী। সেখানে প্রথমে দেখতে হবে আগে কোন সহিংসতা ঘটেছে কিনা, যদি সহিংসতা ঘটে থাকে তবে হিউম্যন হলার বা লোকাল বাস যদি পাওয়া যায় তাতে করে বুড়িগঙ্গা পার হওয়া যেতে পারে। অন্যথায় হেঁটেই বুড়িগঙ্গা পার হওয়া শ্রেয়। তবে এই যাত্রা পথে বাসে চড়াটা যেকোনো সময় বিপদের সামনে দাড় করাতে পারে, তাই বদল করে অটো রিক্সা ব্যবহারই উত্তম। তবে একটাই আশার বিষয় এই যাত্রায় সহযাত্রী হিসেবে পাওয়া যাবে অনেক শংকিত মানুষকে। এই সংকটের সময় সংকটাপন্ন মানুষই একজন আরেকজনের সহায় হয়।

মুন্সিগঞ্জ পার হবার সময় একটু অতিরিক্ত সতর্কতা পালন বাঞ্ছনীয়। সব ঠিকঠাক থাকলে দুপুর ১২ টা নাগাদ পৌঁছে যাওয়া যাবে মাওয়া লঞ্চ ঘাঁটে। লঞ্চ না পাওয়া গেলেও কাওরাকান্দি ঘাঁটে যাবার জন্য একটা ট্রলার নিশ্চয় পাওয়া যাবে। আগত্যা সবাই মিলে পড়িমরি করে এক ট্রলারে ঠাই, যা বিনা নাই অন্য কোন উপায়। মানুষের মনও এক বিচিত্র রহস্যের আঁধার। সব সময়, সব দেশে মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে বেছে নেয় এমন পথ তাতেও থাকে কিনা প্রাণ সংশয়ের সমূহ সম্ভবনা। এর কারণ সম্ভবত মানুষের ঝুকি নেবার প্রবণতা, আর বাছাই করণ নীতি যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘প্রসেস অব এলিমিনেশন’। তবে আশার কথা হল এখন নদী সাধারণত শান্তই থাকে। পদ্মাও ওতটা নির্মম নয় যতটা আমরা হতে পারি।

পদ্মা পেরিয়ে কাওরাকান্দি ঘাট শরীয়তপুর এলাকায় পড়েছে। শরীয়তপুরের পর ফরিদপুর না পেরনো পর্যন্ত নিজেকে মটেই বিপদমুক্ত বলা যায় না। ঘাট থেকে ৫ কিমি দূরে শিবচর বাজার, কে জানে সেখানে কি অপেক্ষা করে থাকবে এই মুক্তাঞ্চল যাত্রীদের। তাই পায়ে হেটে বা ভ্যান- রিক্সা করে সেখানে যাওয়া যেতে পারে। ভাগ্য ভাল হলে সেখান থেকে ডিজেল চালিত ভ্যান পাওয়া যেতে পারে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌঁছাবার জন্য। এর পর অপেক্ষার পালা, যদি কোন যানবাহন পাওয়া যায়- বাস ট্রাক যাই হয় হোক, গোপালগঞ্জ পর্যন্ত যেতে পারলেই কিছুটা স্বস্তি, খানিকটা মুক্তির স্বাদ। তারপর একটা বাধা থাকতে পারে শুধু ফকিরহাট পেরিয়ে নওয়াপাড়ার কাছে কিংবা খান জাহান আলীর মাজার এলাকায়, তবে ও পথ না মাড়িয়ে অন্য বিকল্প পথ ব্যবহার করাই উত্তম। তবুও যতই বন্ধুর হোক এই পথ, শেষে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার জন্য পাওয়া যাবে মুক্ত বাতাস। জানি না কতদিন পর্যন্ত এই জায়গা মুক্তাঞ্চল থাকবে, পাওয়া যাবে মুক্ত বাতাসের স্বাদ।

তিন

বন্ধুকে এই যাত্রাপথের বিবরণ দিতে গিয়ে মনে হচ্ছে আমি ফিরে গেছি ১৯৭১ সালে, তবে বাস্তবতাটা ১৯৭১ থেকে কিছুটা ভিন্ন। ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দিকে দিকে মুক্তির উল্লাস শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু আজ ১০ ডিসেম্বর ২০১৩ দিকে দিকে বন্দী দশার খবর শোনা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে শিকল পরানোর শব্দ। ১৯৭১ এর সাথে আরও একটা দিকে কিন্তু খুব মিল দেখা যায়, তা হল একই শোষকের হুঙ্কার। সেই হুঙ্কার আজ আমাদের মর্ম স্পর্শ করে জানান দিচ্ছে, “ঘরে থাকবে তো বেঁচে থাকবে, বাইরে বের হবে তো মরবে”। মাঝে মাঝে খুব হাসি পায়, এ অবস্থায় মানুষকে মরতে ঘর থেকে বের হতে হবে কেন? এদেশের সাধারণ মানুষতো এমনিতেই মরবে, পার্থক্যটা এই যে কেউ না খেয়ে মরবে, কেউ মরবে বিবেকের দংশনে। লক্ষ মৃত্যুর মাধ্যমে জন্মেছিল যে দেশ, সে দেশের মানুষের মৃত্যুর ধারা এখন বন্ধ হয় নি। একটি প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছে করে, আর কত মৃত্যুর পর এ দেশ স্বাধীন হবে? কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, প্রশ্নটি কার কাছে করব?  এ দেশের কেউই তো মানুষের জীবনের দ্বায় নিতে চায় না। না সরকার, না বিরোধী দল, না কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। যারা প্রকৃত মুক্তির আদর্শে ১৯৭১ সালে স্বেচ্ছায় তাদের প্রাণ দিয়েছিলেন, আমি নিশ্চিত কোন ভাবে আজ তারা বেঁচে থাকলে ঘৃণায় আত্মহত্যা করতেন। তবু সব গ্লানি সহ্য করে আজ এ দেশের সবার কাছে একটি প্রশ্ন করছি, আর কত মৃত্যুর পর এ দেশ স্বাধীন হবে? দেশের দায়িত্ববান মহাশয়বৃন্দ! মনে করুণ প্রশ্নটি আপনার কাছেই করা হয়েছে। আমার উত্তর চাই না, নিজের বিবেকের কাছে উত্তর দিন।



প্রকাশিতঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৩, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২০ 

অনলাইন লিঙ্ক

Categories: Aticles, Politics

Post a Comment

Oops!

Oops, you forgot something.

Oops!

The words you entered did not match the given text. Please try again.

Already a member? Sign In

0 Comments